ইরান যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতির ‘দুঃস্বপ্নের শুরু’

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানি নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও সারের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এর ফলে দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি করছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের সিনিয়র ফেলো এবং আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মরিস অবস্টফেল্ড বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই দুঃস্বপ্নটির কথা ভেবেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার চিন্তা থেকে বিরত ছিল এবং ইসরায়েলকে সংযত থাকতে বলেছিল। এখন আমরা সেই দুঃস্বপ্নের মধ্যেই বাস করছি।
যুদ্ধ শুরুর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলারের নিচে। সোমবার তা লাফিয়ে প্রায় ১২০ ডলারে উঠে যায়, যদিও পরে তা ৯০ ডলারের আশেপাশে স্থিতিশীল হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম ৩ ডলার থেকে বেড়ে ৩.৪৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপে এই ধাক্কা আরও প্রবল হতে পারে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্ব অর্থনীতি ০.২ শতাংশ সংকুচিত হয়। ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী সাইমন জনসন বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতেই হবে। প্রতিদিন এখান দিয়ে ২ কোটি ব্যারেল তেল যায়। বিশ্বের আর কোথাও এই ঘাটতি পূরণ করার সক্ষমতা নেই।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের নেইল শিয়ারিংয়ের মতে, এই যুদ্ধে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো। এর মধ্যে ইউরোপের অধিকাংশ দেশসহ ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া রয়েছে।
তবে সবচেয়ে সংকটময় পরিস্থিতির মুখে পড়েছে পাকিস্তান। দেশটি জ্বালানির ৪০ শতাংশ আমদানি করে এবং কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার আরও বাড়াতে হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে।
বিপরীতে নরওয়ে, রাশিয়া ও কানাডার মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে লাভবান হচ্ছে।
জ্বালানি ছাড়াও বিশ্ববাজারের ৩০ শতাংশ সার (ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া ও ফসফেট) হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। এই সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সারের দাম বাড়ছে। মরিস অবস্টফেল্ডের মতে, এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ হবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে। বিশেষ করে, যেসব স্থানে কৃষি উৎপাদন আগে থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে। সারের দাম বাড়লে বড় ধরনের খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতি এর আগে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে পারলেও এবারের সংকট কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। সাইমন জনসন বলেন, ‘সবকিছুই এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে। তিনি ঠিক কখন বিজয় ঘোষণা করবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।’
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড



