নতিস্বীকারের চেয়ে যুদ্ধই কি বেছে নেবে ইরান?

পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরি আর যুদ্ধবিমানের সারি। যেকোনও মুহূর্তে ধেয়ে আসতে পারে ক্ষেপণাস্ত্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি আর চরম উত্তেজনার মাঝেও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে নতিস্বীকার করতে নারাজ ইরান। তেহরানের এই অনড় অবস্থান মার্কিন কর্মকর্তাদের রীতিমতো বিস্মিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে তাদের আদর্শগত ভিত্তি ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দেওয়ার অর্থ হলো নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করা। তাই ট্রাম্পের দাবি মেনে নেওয়ার চেয়ে যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়াকেই তারা বেঁচে থাকার জন্য কম বিপজ্জনক মনে করছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘাত এড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যুদ্ধ এড়ানোর একটি পথ হিসেবে বেসামরিক উদ্দেশ্যে সীমিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে ইরান যেন কোনোভাবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে না পারে। সেই সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা কমানো এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধের দাবিও রয়েছে ওয়াশিংটনের। বিপরীতে তেহরানের অবস্থান হলো, পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য এবং ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আত্মরক্ষার অধিকার।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং ইরান সরকারের সাবেক কৌশলগত বিষয়ক উপ-সহকারী প্রধান সসান করিমি বলেন, “যুদ্ধ এড়িয়ে চলা অবশ্যই উচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়, তবে তা যেকোনও মূল্যে নয়। একটি আদর্শিক রাষ্ট্র কখনও কখনও বর্তমান অস্তিত্বের চেয়ে ইতিহাসে নিজের স্থানকে বেশি গুরুত্ব দেয়।”
গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত। গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনেও ব্যবহার করা হয়েছে প্রাণঘাতী শক্তি। গত সপ্তাহান্তেও ছোট আকারে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, ইরান এখন এতটাই দুর্বল যে তারা সব দাবি মেনে নেবে। ট্রাম্পের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরানের এই ‘অপ্রত্যাশিত’ অনড় মনোভাবে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।
তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী ওয়ায়েজ বলেন, “ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেওয়া মানে হলো যমদূতের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া। তারা বিশ্বাস করে, একবার নতিস্বীকার করলে চাপ কমবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্র তাদের টুঁটি চেপে ধরতে আরও উৎসাহিত হবে।”
২০২৪ সালে এক ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও একই সুর প্রতিধ্বনি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “পারমাণবিক শক্তি বা মানবাধিকার সমস্যা নয়; আমেরিকার আসল সমস্যা হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব নিয়ে।”
যদি সংঘাত শুরু হয়, তবে তা কতদূর গড়াবে, তা নিয়ে রয়েছে নানা সমীকরণ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ফারজিন নাদিমি মনে করেন, ইরান সম্ভবত গত জুনের মতোই সীমিত হামলা হজম করে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করবে। কিন্তু ট্রাম্প যদি আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে আগান, তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে শুরুতেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে হবে।
অন্যদিকে, ইরান ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের কৌশল অনুসরণ করতে পারে। ২০২৩ সালে হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজ ও রণতরি লক্ষ্য করে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটনকে শতকোটি ডলারের লোকসানে ফেলেছিল। ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক ডলার বেড়ে যেতে পারে। চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অর্থনৈতিক ঝুঁকি ট্রাম্পের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
আলী ওয়ায়েজ সতর্ক করে বলেন, “যুদ্ধ করলেই যে ইরান নমনীয় হবে বা কূটনীতি সহজ হবে, এটা ভাবা আসলে এক ধরনের বিভ্রম।”



