Uncategorized

ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকার লড়াই, ফিকে উৎসবের রঙ

পঁচিশ বছর বয়সী আমজাদ জুদাহর কাছে রমজানের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি ছিল বাবা আর ভাইদের সঙ্গে হাত ধরে মসজিদে তারাবি পড়তে যাওয়া। গাজা সিটির উত্তরে আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির এক কোণে বসে সেই স্মৃতি হাতড়াচ্ছিলেন পেশায় ব্যবসায়ী এই তরুণ। আমজাদ বলেন, ‘আমরা হাত ধরাধরি করে মসজিদে যেতাম। কিন্তু এই বছর আমি একাই যাচ্ছি।’

দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি হামলায় গাজার জনজীবন আজ লণ্ডভণ্ড। ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের জন্য এবারের রমজান এসেছে কেবলই হারানোর হাহাকার হয়ে। ইসরায়েলি হামলায় গাজার অধিকাংশ মসজিদ এখন ধ্বংসস্তূপ। ফলে আগের মতো আর জামাতে নামাজ পড়ার সুযোগ নেই।

একটি বিমান হামলায় বাবা-মা আর ছোট চার ভাইবোনকে হারিয়েছেন আমজাদ। এখন আছে কেবল বুলেটের ক্ষত চিহ্নওয়ালা নড়বড়ে একটি ঘর। আমজাদ বলেন, ‘পুরো ঘর এখন শোকের চাদরে ঢাকা। ইফতারের সময় মনে হয় চারদিকে আমার পরিবারের সদস্যরা বসে আছে। মা আর বোন ইফতারের এক ঘণ্টা আগে স্যুপ আর খাবার তৈরি করত। বাবা রেডিওতে কোরআন তেলাওয়াত ছেড়ে দিতেন। আর আমার ভাইয়েরা কনাফেহ (ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি) কার আগে কে নেবে, তা নিয়ে ঝগড়া করত। এখন আমি জানি, একার জন্য পুরো টেবিল সাজানোর বেদনা কতটা।’

গাজা সিটির উপকূলে একটি জীর্ণ তাঁবুতেই তিন সন্তানকে নিয়ে রমজান কাটছে ৪১ বছর বয়সী সানা আল-শারবাসের। তার স্বামী যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। আগে যেখানে মাসে ৮০০ ডলার আয় করতেন, এখন সেখানে পান মাত্র ২০০ ডলারের সাহায্য।

সেহরি খাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে

টাকার অভাবে এবার সন্তানদের জন্য একটি লণ্ঠনও কিনতে পারেননি সানা। হাতে তৈরি কাগজের মালা দিয়ে তাঁবু সাজিয়েছেন তিনি। সানা বলেন, ‘আগে প্রতি রমজানে আমি লণ্ঠন কিনতাম। এবার লণ্ঠনের দাম পাঁচ গুণ বেড়েছে। বাচ্চারা যখন জিজ্ঞেস করে কবে লণ্ঠন কিনব, আমি বলি, আগামী সপ্তাহে। আমি জানি সেই সপ্তাহ আর কখনও আসবে না।

মাংস কেনার সামর্থ্য নেই বলে মাংস ছাড়াই এবার রমজানের প্রথম দিনের ঐতিহ্যবাহী ‘মলোখিয়া’ রান্না করেছেন সানা। স্বামী কথা বলতে পারেন না, তাই সন্তানদের কাছে তিনি লুকিয়ে রাখেন বাবার অসহায়ত্ব। সানা বলেন, ‘রমজান ছিল শিশুদের আনন্দের সময়, এখন রমজান মানেই হলো যা নেই তার অভাববোধ করা।’

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ইহাব হাসনাইনের জন্য এবারের রমজান অসহনীয় কষ্টের। কয়েক মাস আগেই অসুস্থতায় ভুগে মারা গেছেন তার স্ত্রী। ইহাব বলেন, ‘তাকে ছাড়া ইফতারের কথা ভাবতেই পারছি না। সব কিছু সে গুছিয়ে রাখত।’

ইহাবের তিন সন্তান এখনও মানতে পারছে না যে মা নেই। ১২ বছর বয়সী মেয়ে রেতাল বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘মা কি আমাদের সঙ্গে রোজা রাখছেন?’ ইহাব চোখের জল চেপে উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ, মা ইফতারিতে কাতায়েফ (মিষ্টি) খাচ্ছেন।’ ইহাব চান না তার স্ত্রী কেবল ফ্রেমবন্দি ছবি হয়ে থাকুক, তাই প্রতি ইফতার ও সাহরিতে তিনি সন্তানদের তার মায়ের গল্প শোনান।

গাজার প্রতিটি ঘরে এখন একই চিত্র। মসজিদ নেই, প্রিয়জন নেই, টেবিল ভর্তি খাবার নেই; তবুও ধ্বংসস্তূপের মাঝেই মানুষ যৎসামান্য যা আছে তা নিয়েই রোজা রাখছেন। রমজানের পুরনো রীতিনীতি হয়তো হারিয়ে গেছে, ইফতারের চেয়ারগুলোও হয়তো খালি পড়ে আছে, কিন্তু ফিলিস্তিনিরা তাদের অন্তরে এখনও লালন করছেন বিশ্বাসের সেই প্রদীপ।

তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি অবলম্বনে।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button